দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইউক্রেনের ধারাবাহিক ও জোরালো হামলার মুখে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ক্রিমিয়ায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, জ্বালানি সংকট এবং শিশুদের গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প বন্ধের মতো পদক্ষেপে উপদ্বীপজুড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়ার বৃহত্তম শহর সেভাস্তোপোলে কয়েকদিন ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে। শহরটির রুশ-নিযুক্ত গভর্নর মিখাইল রাজভোজায়েভ জানিয়েছেন, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার সতর্কতার কারণে বিদ্যুৎ অবকাঠামো মেরামতের কাজ বারবার বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকবে।
ইউক্রেনের ড্রোন বাহিনীর কমান্ডার রবার্ট ব্রোভদি দাবি করেছেন, গত বুধবার ভোরে সেভাস্তোপোলের প্রধান বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে সাত দফা হামলা চালানো হয়েছে।
২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নেয়, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। এরপর থেকে অঞ্চলটি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ইউক্রেন সবসময়ই ক্রিমিয়া পুনর্দখলের লক্ষ্য ঘোষণা করে এসেছে। ২০২২ সালে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরুর পর সেই লক্ষ্য আরও জোরালো হয়।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেন ক্রিমিয়ায় সামরিক অভিযান আরও জোরদার করেছে। এর ফলে উপদ্বীপজুড়ে ঘন ঘন ড্রোন হামলা, জ্বালানি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা এবং শিশুদের গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প স্থগিতের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সেভাস্তোপোলের এক বাসিন্দা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে জানান, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দিনে কয়েকবার বিমান হামলার সতর্কতা জারি হচ্ছে। আগে কৃষ্ণসাগরের ওপর ড্রোন প্রতিহত করা হলেও এখন শহরের আকাশেই প্রতিরোধ অভিযান চলছে। এতে নগরী আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রুশ-নিযুক্ত প্রশাসন জানিয়েছে, সরকারি সংস্থাগুলো ছাড়া সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে জ্বালানি বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ওই বাসিন্দা বলেন, অধিকাংশ পেট্রোলপাম্পে জ্বালানি নেই। তবে গণপরিবহন এখনো চলাচল করছে। সংকট শুরুর আগে তিনি আগের তুলনায় অনেক বেশি দামে জ্বালানি কিনে রেখেছিলেন।
ইউক্রেনের ড্রোন হামলার পর কের্চ প্রণালির সেতু সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হলে দক্ষিণ রাশিয়ার সঙ্গে সংযোগকারী সড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। শুক্রবার সকালে ক্রিমিয়া ছাড়তে প্রায় দুই হাজার ৮০০ যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছে বলে জানিয়েছে রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস।
ক্রিমিয়া দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পর্যটন শিল্পও চাপের মুখে পড়েছে। রুশ-নিযুক্ত প্রশাসনের প্রধান সের্গেই আকসিওনভ ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিশুদের সব গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প বন্ধ থাকবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে সিমফেরোপোল শহরের ফাঁকা সড়ক ও জনশূন্য পরিবেশ দেখা গেছে। একটি ভিডিওতে এক নারী বলেন, ‘মনে হচ্ছে শহরটি যেন কোনো মহাপ্রলয়ের মধ্যে আছে।’ আরেকটি ভিডিওতে স্থানীয় এক ব্যক্তি দাবি করেন, ক্যাফে ও খাবারের দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সুপারমার্কেটের তাকও প্রায় খালি হয়ে গেছে।
তবে নোভি স্ভেত এলাকার একটি অতিথিশালার মালিক জানিয়েছেন, পর্যটকেরা এখনো আসছেন। তার ভাষায়, ‘মানুষ আতঙ্কিত নয়, তবে সতর্ক। সমুদ্রসৈকত, ক্যাফে ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো এখনো চালু রয়েছে। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।’
জ্বালানি বিক্রি বন্ধের ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভও দেখা গেছে। এক ট্যাক্সিচালক লিখেছেন, জ্বালানি না পেলে পরিবার চালানো ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। আরেক ব্যবসায়ী জানান, ডিজেল না থাকায় তার পচনশীল খাদ্যপণ্য সরবরাহ কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়েছে। অন্য এক বাসিন্দার অভিযোগ, ট্রলিবাসে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কর্মস্থলে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন এখন পরিকল্পিতভাবে ক্রিমিয়াকে দক্ষিণ রাশিয়ার সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ক্রিমিয়ায় পরিচালিত অভিযান এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে রাশিয়া শেষ পর্যন্ত শান্তির পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক তাতিয়ানা স্তানোভায়ার মতে, ক্রিমিয়ায় অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়লেও তা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কৌশলগত অবস্থান বদলে দেবে— এমন সম্ভাবনা কম। তার ভাষায়, এসব হামলা রাশিয়ার জনগণের মধ্যে ইউক্রেনবিরোধী মনোভাব আরও বাড়াতে পারে, তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বড় পরিবর্তন আনবে না।
সূত্র: সিএনএন
এমএস/